Showing posts with label সমালোচনা. Show all posts
Showing posts with label সমালোচনা. Show all posts

Tuesday, 16 December 2008

পিতৃতন্ত্র, প্রতিশোধ ও 'মেয়েটি'

'মেয়েটি'। নাটকের নাম শুনে মনে হয়েছিল আর পাঁচটা চেনা ছকের মতই কোনো এক মেয়ের স্বপ্ন ভাঙ্গার গল্প যা দিয়ে দর্শকের মনটাকে ছোঁওয়া যায়। দেখার পরে উপলব্ধি হল শুধু স্বপ্ন ভাঙ্গাই নয়, ভাঙ্গার কারণটাও নগ্নভাবে সবার সামনে এসে পড়েছে। আর দর্শক হিসেবে আমি তখন পুরো সমাজটার সাথে সমাজব্যবস্থার সাথে দাঁড়িয়ে আছি আসামীর কাঠগড়ায়।

এ নাটকের পটভূমিকা চিলি। সদ্য স্বৈরতন্ত্রের অবসানের পর এসেছে গণতন্ত্র। জেরার্দো এস্কোবার গণতান্ত্রিক চিলির তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান, যাঁর কাজ স্বৈরাচারী যুগের নিখোঁজ ও নিপীড়িত মানুষদের প্রতি সুবিচার করা। যেদিন জেরার্দো চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয় সেদিন রাতে তাঁর গাড়ি রাস্তায় হঠাৎ অচল হয়ে যাওয়ায় এক ডাক্তার তাঁকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন এক ডাক্তার রবার্তো মিরান্দা। যার গলার আওয়াজ শুনে জেরার্দোর স্ত্রী পলিনা বুঝতে পারে এই সেই ডাক্তার যে ১৫ বছর আগে এক ডিটেনশন ক্যাম্পে তাকে ধর্ষণ করেছিল। ডাক্তারকে জেরার্দো সেরাতে তাঁর বাড়িতেই থেকে যেতে বলে। এরপরেই শুরু হয় পলিনার প্রতিশোধের পালা। নেশায় বেহুঁশ ডাক্তারকে সে একটা চেয়ারে হাত-পা-মুখ বেঁধে শুরু করে তার জেরা। জেরার্দো পলিনাকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করে এটা কোনো সমাধান নয়, কারণ সে সময়ে পলিনার চোখ বাঁধা ছিল। শুধু গলার আওয়াজ কোনো প্রমাণ নয়। পলিনা ডাক্তারের গাড়ি থেকে বের করে আনে শুবার্টের কম্পোজিশন 'ডেথ অ্যান্ড দ্য মেডেন' যা ডাক্তার বাজিয়েছিল পলিনাকে বারবার ধর্ষণের সময়। ক্রমশ পলিনার জেরা, ডাক্তারের সবকিছু অস্বীকার এবং জেরার্দোর মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে এগোতে থাকে নাটক। অবশেষে প্রাণভয়ে ভীত ডাক্তার স্বীকার করে সে পরপর চোদ্দবার পলিনাকে ধর্ষণ করেছিল। জেরার্দো খুন করতে যায় ডাক্তারকে। কিন্তু পলিনা ডাক্তারের বাঁধন খুলে দেয়।

স্বৈরতন্ত্র ও পুরুষতন্ত্রকে একই কাঠগড়ায় দাঁড় করায় 'মেয়েটি'। যে জেরার্দোর নাম না বলার জন্যে পলিনাকে ডিটেনশন ক্যাম্পের অকথ্য শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়, ক্যাম্প থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে পলিনা ফিরে এসে দেখে সেই জেরার্দো অন্য এক মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে মা-কে আমরা বসাই বেশ উঁচু জায়গায় সেটা যে কতটা হাস্যকর কতটা ঠুনকো তা ধরা পড়ে যায় যখন পলিনা বলে "গালাগাল দেওয়ার সময় তো সবাই বলে 'son of a bitch', কই কেউ তো বলেন না 'son of a dog'!" পুরো নাটকে বিচারকের ভূমিকায় থাকা জেরার্দোর প্রতীতি জন্মায় ডাক্তারের স্বীকারোক্তির পরে। তার এতদিনের বিচার বলে আইন নিজের হাতে না নিতে কিন্তু তার পুরুষত্ব তাকে বলে ডাক্তারকে শাস্তি দেওয়া তাঁর কর্তব্য। পলিন ফিরে আসে প্রতিদিনের জীবনছন্দে। ক্লেদাক্ত অতীত সরিয়ে বর্তমানের স্বপ্ন দেখে। বাঁধাধরা ছকের ডাক্তার এবং জেরার্দো দু'জনেই হতবাক হয়ে যায় পলিনের এই আচরণে।

একইসঙ্গে এ নাটক প্রশ্ন তোলে আমাদের প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে। কতদিন আমরা 'চোখের বদলে চোখ' নীতি নিয়ে চলব! কিন্তু পলিনার ভাবনার স্বচ্ছতায় সমধানও আসে। একসময় কোনো এক পক্ষকে থামতেই হয়। কিন্তু থামার আগে পলিনা রেখে যায় আরেক প্রশ্ন। "কেন সবসময় আমাদেরই থামতে হবে? যারা অসহায়, দুর্বল তাদেরকেই কেন থামতে হবে?" নাটকের শেষে ছাড়া পেয়ে ডাক্তার যখন গুটিগুটি পায়ে মঞ্চ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তার মুখে আমরা দেখতে পাই অপরাধবোধের জ্বালা। কিন্তু যদি অপরাধবোধের আগুনে পুড়ে অপরাধী মনটাই শুদ্ধ না হয়? তাহলে ক্ষমার তাৎপর্য কি?

এরিয়েল ডর্ফম্যানের 'ডেথ অ্যান্ড দ্য মেডেনে' নাটকের অনুবাদ করেছেন কাবেরী বসু। কিশোর সেনগুপ্তের নির্দেশনায় মাত্র তিনটি চরিত্র একটি সেট প্রায় দু'ঘন্টা (একটি দশ মিনিটের বিরতিসহ) আছন্ন করে রাখে দর্শককে। অসাধারণ দাপটে পলিনার চরিত্রে অভিনয় করেন বিন্দিয়া ঘোষ। তাঁর স্বরক্ষেপণের বৈচিত্র্য পলিনার চরিত্রে আলাদা মাত্রা এনে দেয়। ডাক্তার রবার্তোর চরিত্রটিকে গৌতম হালদার তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় পরিবেশন করেছেন। জেরার্দোর ভূমিকায় কিশোর সেনগুপ্তও চরিত্রানুগ। তবে কয়েকটি টেকনিক্যাল ত্রুটির মধ্যে উল্লেখ্য টেলিফোনের অপর প্রান্তের গলা রেকর্ড করে চালানোতে সময়ের একটু এদিক ওদিক হওয়ায় তাল কেটে যায়।

শুবার্টের কম্পোজিশন, মোকামের সংগীত, পর্দার পেছনে আলোর খেলা আর তার মাঝে পলিনার লাঞ্ছিত জীবনের প্রতিশোধ, ডাক্তারের ক্ষমাপ্রার্থনা, জেরার্দোর তথাকথিত পুরুষত্ব আর তার বিবেকের টানাপোড়েন - সব মিলে আমাদের নতুন করে ভাবায় আমাদের সমাজ নিয়ে, আমাদের রাজনীতি নিয়ে, পুরুষতন্ত্র নিয়ে। শেখায় কদর্যতা, বীভৎসতা, নিষ্ঠুরতা, প্রতিশোধস্পৃহার অনেক ঊর্ধ্বে জীবন।

Sunday, 14 December 2008

অজ্ঞাতবাস : নাটকের মাঝে নাটক

যেসব মানুষেরা প্রতিনিয়তই আমাদের অজ্ঞাতে চলে যাচ্ছেন অজ্ঞাতবাসে, তাঁদের চাওয়া-পাওয়া নিয়েই নান্দীকারের নতুন নাটক 'অজ্ঞাতবাস'। মানুষের জীবনে সমস্যাই বোধহয় সবচেয়ে বেশী। সেই সমস্যার সমাধানও হয় নানারকমের। নিঃসঙ্গতার এক নতুন সমাধানের সন্ধান দেয় 'অজ্ঞাতবাস'। সমাধান? হয়তো নয়!

নববিবাহিত দম্পতি সৌমিক এবং পায়েল বাস করে একটি সুন্দর সাজানো গোছানো বাড়িতে। আপাতদৃষ্টিতে তারা সুখী। বিয়ের পরই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সৌমিকের বাবা বিয়ের যৌতুক হিসেবে পায়েলের হাতে তুলে দেন ঐ বাড়ীর চাবি। সৌমিক নিজেও খুশি হয়, ভাবে পায়েলও খুশি হবে। কিন্তু পায়েলের সবার সঙ্গে সংসার করার স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়, একা হয়ে যায়। তার শ্বশুরের আশা ছিল "যাওয়া-আসা থাকবে, ফোনাফুনি থাকবে আর দূরত্বের জন্য থাকবে চোরাটান।" কিন্তু সময়ের ফাঁকে সেই চোরাটানও কে চুরি করে নেয়। তাদের এই বয়ে চলা জীবনের মাঝে একদিন এসে পড়েন এক বৃদ্ধা। প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা কিন্তু কোথায় বাড়ি, কোথায় যাচ্ছিলেন কিছুই মনে করতে পারেন না। জল চাওয়ার অছিলায় ঢুকে পড়েন পায়েলের বাড়িতে। ক্রমশ তাদের সংসারে। সৌমিক অফিস থেকে ফিরে ডাক্তার-পুলিস করে। কিছুতেই মেনে নিতে পারে না হঠাৎ এসে পড়া এই আপদকে। কিন্তু প্রাণোচ্ছল আকর্ষণীয়া এই বৃদ্ধার উত্তরের কাছে হেরে যায় পুলিস ডাক্তার সবাই। প্রত্যেকটি চরিত্রের পরের পদক্ষেপ তাঁর জানা। তাতেই বোঝা যায় তাঁর এইভাবে হারিয়ে যাওয়া এই প্রথম নয়। একসময় সৌমিকও ধরা দেয় মায়ার বাঁধনে। দু'টো মানুষও একা হয়ে যায়। তাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে এই বৃদ্ধা একদিনের জন্য হঠাৎ ব্যস্ততার হাওয়া বইয়ে দেন। বহুদিন পরে হারমোনিয়াম বেরোয়, সৌমিক বলে ওঠে "শেষ কবে নিজের বাড়িতে এরকম চেঁটেপুটে খেয়েছি মনে পড়ে না!", রাত্রে ঘুমোতে যাওয়ার আগে দু'জনে মিলে ভাবতে বসে কিরকম হয় যদি পরেরদিন জানা যায় যে অনুরাধা দেবী ওদের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়া, যাকে ওরা ভুলে গিয়েছে! কেমন হয় যদি কাল থেকে উনি ওদের সঙ্গেই থাকবেন! 'মাসিমা'র গানের সঙ্গে তাদের মনও গেয়ে ওঠে "সকল দুয়ার আপনি খুলিল, / সকল প্রদীপ আপনি জ্বলিল, / সব বীণা বাজিল নব নব সুরে সুরে।।"

কিন্তু পরেরদিন সকালেই বৃদ্ধার সব কথা মনে পড়ে যায়। সৌমিক তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসে। কিন্তু বৃদ্ধা নেমে যান বাড়ির কিছু আগেই, যদি বাড়ির লোক তাঁর ভুলোমনের জন্য সৌমিকের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে সেই আশঙ্কায় সৌমিককে ফিরে যেতে বলেন। কিন্তু সৌমিক পিছু নিয়ে বুঝতে পারে বৃদ্ধার জন্য কেউই অপেক্ষা করে ছিল না। কেউই ওঁর জন্য সারারাত দুশ্চিন্তা করেনি, কেউ ছটফট করেনি উনি দিনের শেষে বাড়ি ফিরে আসেননি বলে। তখনি তার কাছে ধরা পড়ে যায় একাকীত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে, একটু গল্প করার লোকের খোঁজে, একদিনের জন্যে হলেও স্নেহ-ভালোবাসায় জড়িয়ে পড়ার জন্যে অনুরাধা ব্যানার্জীর একই নাটকে বারবার অভিনয়ের খেলা। নিজেই নিজের স্মৃতি ভুলে অজ্ঞাতবাসে যাওয়ার নাটক। নাটক পূর্ণতা পায় যখন বৃদ্ধা পায়েল অনুরাধা দেবীর দেখানো পথে বেরিয়ে পড়ে অজ্ঞাতবাসে।

সুমন্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের নির্দেশনা ত্রুটিহীন। নাটকে নতুন মাত্রা দান করে প্রোজেক্টরের ব্যবহার। নাটকের আবহ পরিবেশনায় প্রোজেক্টরের ব্যবহার প্রচলিত। কিন্তু এখানে গল্প বলাতেই আনা হয়েছে চলচ্চিত্র। সৌমিকের অনুরাধা দেবীকে পৌঁছে দেওয়া এবং পিছু নেওয়া পুরোটাই প্রোজেক্টরের সাহায্যে উপস্থাপিত। ত্রিমাত্রিক থেকে দ্বিমাত্রিকে এই হঠাৎ পরিবর্তন খাপছাড়া লাগে না, বরং মুগ্ধ করে। তবে প্রথম দৃশ্যে পরিচারিকার স্থূল অঙ্গভঙ্গী এবং হালকা চালের অভিনয় নাটকের পরিপ্রেক্ষিতে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।

সোহিনী হালদার, স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত এবং রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তকে দেখে কখনোই মনে হয় না তারা অভিনয় করছেন। অনায়াস ভঙ্গীতে আমাদের ঘরোয়া দৃশ্যের দর্শক করে নেন। নববিবাহিতা বধূ এবং বৃদ্ধা - একটি চরিত্র থেকে আরেকটিতে অনায়াসে বিচরণ করে যান সোহিনী হালদার। অনুরাধা দেবীর চরিত্রে স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত আলাদা মাত্রা যোগ করেন যখন হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান ধরেন "মন্দিরে মম কে আসিলে হে! / সকল গগন অমৃতমগন, / দিশি দিশি গেল মিশি অমানিশি দূরে দূরে।।" স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় মনোরোগে স্বল্পজ্ঞানী এক সাধারণ চিকিৎসককে স্বল্প সময়ে নিখুঁতভাবে মঞ্চে উপস্থাপন করেছেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। শুধু নির্দেশক সুমন্ত গঙ্গোপাধ্যায় প্রথমার্ধে যখন বিরক্তি প্রকাশ করেন বৃদ্ধার প্রতি তখন তা অতিনাটকীয়তার পর্যায়ে চলে যায়। কিন্তু সৌমিক যখন পায়েলকে বৃদ্ধার বাড়ির মিথ্যা বিবরণ দিতে দিতে বাচ্চার মত কেঁদে ফেলে দর্শকের মনো উথাল-পাথাল করে ওঠে।

অনুরাধা দেবীর নিজের জীবনকে এইরকমভাবে নিজের পরিচালিত নাটক করে নেওয়া দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় সুচিত্রা ভট্টাচার্য্যের শান্তি পারাবারের চারু ঠাম্মার কথা। যার নাতি বৃদ্ধাবাসে তার সঙ্গে দেখা করতে আসত তাঁর তোশকের নীচে রাখা কয়েনের লোভে। ঠাকুমা অন্যমনস্ক হলেই ঝটপট সেগুলো পকেটে পোরে। চারু ঠাম্মা দেখেও দেখেন না। নাতি আসার আগে নিজেই সাজিয়ে রাখেন কয়েগুলো। নাতির আসা বজায় রাখতে। রুদ্রপ্রসাদের কথায় এই নাটকের জন্য কাউকেই দোষী করা যায় না। "আমরা ভয় পাই ভালোকে স্বীকার করতে। কারণ ভালো জিনিস বড় কাঁদায়। কিন্তু মানুষ যখন ভালোকে স্বীকার করে নিতে পারে তখন সে কেঁদে কেঁদে শুদ্ধ হয়।" মাঝে শুদ্ধ হলে বোধহয় মনটাও একটু পরিষ্কার হয় তখন বোধহয় মানুষের আয়তনের জায়গাটাকেই স্পেস বলে ভুল করি না, মনেও জায়গা করে দিতে শিখি।

Friday, 12 December 2008

'ফুলমতি' রূপা

'ফুলমতি'। দেখতে দেখতে একবার মনে হল এ নাটক পরিবেশবাদীদের মনের কথা বলে, আবার কখনো মনে হল এ নাটক সাম্প্রতিককালের শিল্পের জন্য ভূমিদখলের প্রতি আক্রমণ, আবার এরকমও মনে হল যে নাট্যমেলার থিম 'নারী'-র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পেশ করা নারীর বন্দনা।

কন্নড় উপকথাকে আশ্রয় করে এগিয়েছে 'ফুলমতি'। রূপা প্রকৃতিকন্যা নাকি মানুষের বেশে প্রকৃতিই? ইচ্ছেমত সবুজ সতেজ বৃক্ষ হতে পারে সে। তাই পুরুষের চোখে সে অনন্যা। অন্য নারীদের কাছে ঈর্ষণীয়। কিন্তু রূপা কখনই দেবী হতে চায়নি। তার কথাতেই "আমি চিনতে নারি, ভাবতে নারি / চাই না হতে পরবাসী / কর আমায় খেলার সাথী / কোরো না দেবী।" মাত্র একবারই সে নিজে থেকে ফুলমতি হতে চায়। যখন সে পরীক্ষা করতে চায় যার জন্যে সে এতদিন অপেক্ষা করে আছে, সে কি তার অপেক্ষার যোগ্য? কিন্তু হায়! রূপকুমার সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় না। যুদ্ধের শেষে ফুলমতি রূপা বড় একা হয়ে যায়! তার এতদিনের সঙ্গীসাথীরা সবাই যে মারা গেছে। তাই সেও ফিরে যায় প্রকৃতিমায়ের বুকে।

নাটকের পরিবেশনায় মুখ্য ভূমিকা লোকায়ত ভঙ্গীর। গল্পের অধিকাংশই গীতবাদ্য ও নৃত্যের সমন্বয়েই পরিবেশিত। সেই লোকায়ত ভঙ্গীতে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে বৃক্ষ সহনশীল, বৃক্ষ যা গ্রহণ করে তার চেয়ে অনেক বেশি ফিরিয়ে দেয়। বৃক্ষের মহিমার সমতুল মহিমা একমাত্র নারীই অর্জন করতে পারে। তাই নারীই শুধু পারে বৃক্ষ হতে। তাই রূপক বা রূপকুমার কেউই বুঝতে পারে না রূপার অন্তরের ব্যথা। রূপাও মুখ ফুটে কখনো প্রকাশ করে না সে কথা। মাত্র একবারই আমরা আভাস পাই, যখন রূপা বলে "স্বপ্ন অপেক্ষায় সুন্দর, সাক্ষাতে নির্মম!" তখনি আমরা আন্দাজ করতে পারি ফুলমতি হওয়ার যন্ত্রণা, মানুষ থেকে দেবীতে উত্তরণের একাকীত্ব।

অভিনয়ে অনবদ্য রূপা এবং রাজা। রূপকুমারের অভিনয় সাবলীল হলেও ঠিক খাপ খায় না। রূপকের অভিনয় যথাযথ। রূপার হাসি-কান্না, ভয়-বিস্ময় - প্রত্যেক মূহুর্তের অনুভূতির দোলাচল তার অভিনয়ে স্পষ্ট। রাজার চরিত্র এই নাটকে হাস্যরসের যোগান দেয়, তাই আলাদা করে উল্লেখের দাবী রাখে। রাজসভার দৃশ্যতে প্রায় প্রতিটি সংলাপই শাশ্বত রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করে। বিশেষত রাজা যখন বলেন "সিদ্ধান্ত? সে তো হয়েই আছে। সভার কাজ তো শুধু শোনা।" আর মন্ত্রীর গলার উত্তরীয় ধরে বণিকের তাকে টানাহেঁচড়া করা - সাম্প্রতিক বাণিজ্যমূখী শাসনব্যবস্থার এরকম রূপক স্বাভাবিকভাবেই প্রশংসাযোগ্য।

নির্দেশক গৌতম রায়চৌধুরীর কথায় "একটা নাটককে কোনো একটা স্লোগান দিয়ে বেঁধে দেওয়াটা ঠিক নয়। নাটকের অনেক অভিমুখ থাকে। নাটক দেখার পর দর্শক যদি নানা বিরুদ্ধমতের দৌরাত্ম্যে দোলাচল করতে থাকে তবেই তার চিন্তার জগতে নানারকম আলোড়ন উঠতে পারে। আর সেটা হলেই প্রযোজনা সার্থক হয়।" সেই নানামতের দৌরাত্ম্য হয়েছে, সেদিক থেকে 'ফুলমতি' সার্থক প্রযোজনা।