'ফুলমতি'। দেখতে দেখতে একবার মনে হল এ নাটক পরিবেশবাদীদের মনের কথা বলে, আবার কখনো মনে হল এ নাটক সাম্প্রতিককালের শিল্পের জন্য ভূমিদখলের প্রতি আক্রমণ, আবার এরকমও মনে হল যে নাট্যমেলার থিম 'নারী'-র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পেশ করা নারীর বন্দনা
।কন্নড় উপকথাকে আশ্রয় করে এগিয়েছে 'ফুলমতি'
। রূপা প্রকৃতিকন্যা নাকি মানুষের বেশে প্রকৃতিই? ইচ্ছেমত সবুজ সতেজ বৃক্ষ হতে পারে সে
। তাই পুরুষের চোখে সে অনন্যা
। অন্য নারীদের কাছে ঈর্ষণীয়
। কিন্তু রূপা কখনই দেবী হতে চায়নি
। তার কথাতেই "আমি চিনতে নারি, ভাবতে নারি / চাই না হতে পরবাসী / কর আমায় খেলার সাথী / কোরো না দেবী
।" মাত্র একবারই সে নিজে থেকে ফুলমতি হতে চায়
। যখন সে পরীক্ষা করতে চায় যার জন্যে সে এতদিন অপেক্ষা করে আছে, সে কি তার অপেক্ষার যোগ্য? কিন্তু হায়! রূপকুমার সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় না
। যুদ্ধের শেষে ফুলমতি রূপা বড় একা হয়ে যায়! তার এতদিনের সঙ্গীসাথীরা সবাই যে মারা গেছে
। তাই সেও ফিরে যায় প্রকৃতিমায়ের বুকে
। নাটকের পরিবেশনায় মুখ্য ভূমিকা লোকায়ত ভঙ্গীর
। গল্পের অধিকাংশই গীতবাদ্য ও নৃত্যের সমন্বয়েই পরিবেশিত
। সেই লোকায়ত ভঙ্গীতে বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে বৃক্ষ সহনশীল, বৃক্ষ যা গ্রহণ করে তার চেয়ে অনেক বেশি ফিরিয়ে দেয়
। বৃক্ষের মহিমার সমতুল মহিমা একমাত্র নারীই অর্জন করতে পারে
। তাই নারীই শুধু পারে বৃক্ষ হতে
। তাই রূপক বা রূপকুমার কেউই বুঝতে পারে না রূপার অন্তরের ব্যথা
। রূপাও মুখ ফুটে কখনো প্রকাশ করে না সে কথা
। মাত্র একবারই আমরা আভাস পাই, যখন রূপা বলে "স্বপ্ন অপেক্ষায় সুন্দর, সাক্ষাতে নির্মম!" তখনি আমরা আন্দাজ করতে পারি ফুলমতি হওয়ার যন্ত্রণা, মানুষ থেকে দেবীতে উত্তরণের একাকীত্ব
। অভিনয়ে অনবদ্য রূপা এবং রাজা
। রূপকুমারের অভিনয় সাবলীল হলেও ঠিক খাপ খায় না
। রূপকের অভিনয় যথাযথ
। রূপার হাসি-কান্না, ভয়-বিস্ময় - প্রত্যেক মূহুর্তের অনুভূতির দোলাচল তার অভিনয়ে স্পষ্ট
। রাজার চরিত্র এই নাটকে হাস্যরসের যোগান দেয়, তাই আলাদা করে উল্লেখের দাবী রাখে
। রাজসভার দৃশ্যতে প্রায় প্রতিটি সংলাপই শাশ্বত রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করে
। বিশেষত রাজা যখন বলেন "সিদ্ধান্ত? সে তো হয়েই আছে
। সভার কাজ তো শুধু শোনা
।" আর মন্ত্রীর গলার উত্তরীয় ধরে বণিকের তাকে টানাহেঁচড়া করা - সাম্প্রতিক বাণিজ্যমূখী শাসনব্যবস্থার এরকম রূপক স্বাভাবিকভাবেই প্রশংসাযোগ্য
। নির্দেশক গৌতম রায়চৌধুরীর কথায় "একটা নাটককে কোনো একটা স্লোগান দিয়ে বেঁধে দেওয়াটা ঠিক নয়
। নাটকের অনেক অভিমুখ থাকে
। নাটক দেখার পর দর্শক যদি নানা বিরুদ্ধমতের দৌরাত্ম্যে দোলাচল করতে থাকে তবেই তার চিন্তার জগতে নানারকম আলোড়ন উঠতে পারে
। আর সেটা হলেই প্রযোজনা সার্থক হয়
।" সেই নানামতের দৌরাত্ম্য হয়েছে, সেদিক থেকে 'ফুলমতি' সার্থক প্রযোজনা
।